কুমিল্লায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, সাত মাসে ৮৩ খুন

ইপেপার / প্রিন্ট ইপেপার / প্রিন্ট

কুমিল্লায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে । এ জেলায় গত সাত মাসে ৮৩ খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩৩টি ডাকাতি ও ৩০২টি চুরির ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এর কোনো কোনোটিতে জড়িত অপরাধীরা গ্রেপ্তার হলেও আইনের ফাঁকফোকরে বেরিয়ে এসে ফের জড়িয়ে পড়ে অপরাধে। এতে জেলাজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে । পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় বেপরোয়া কিশোর গ্যাং স্থানীয়দের মধ্যে উৎকণ্ঠা ছড়াচ্ছে ।

 

শহর কিংবা মহাসড়কে রাতে কোলাহল কমতে থাকলে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীদের উৎপাত বাড়ে। সম্প্রতি ছিনতাইকারীদের নৃশংসতায় প্রাণ হারান কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী। ছিনতাইকারীরা কখনো যাত্রীর ছদ্মবেশে, কখনো আবার চালকের ছদ্মবেশে অপরাধ সংঘটিত করে।

- Advertisement -

পুলিশের গাড়িতে হামলা, বাড়ি থেকে কিশোরীকে অপহরণ কিংবা চোরাকারবারিদের ফুটেজ ধারণ করতে গেলে সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং মাদকবিরোধী সমাবেশে স্কুল শিক্ষার্থীর ওপর গুলির ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে ।

 

জেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত অপরাধ চিত্রে দেখা যায়—ডিসেম্বরে ৯, জানুয়ারিতে ১৪, ফেব্রুয়ারিতে ১২, মার্চে ১১, এপ্রিলে ১০, মে মাসে ১৭ এবং জুনে ১০টিসহ মোট ৮৩ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে । একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৯৭টি ।

 

এছাড়া গত ছয় মাসে চুরির ঘটনা ঘটেছে ৩০২টি, ডাকাতি ৩৩ এবং অপহরণ ১৪টি। অপমৃত্যু হয়েছে ৩৪৮টি। এ সময় পুলিশ ৪৮টি অস্ত্র উদ্ধারে সক্ষম হয় ।

 

মাদক ব্যবসা এবং এলাকার আধিপত্যকে কেন্দ্র করে ২৫ জুন নগরীর কাঁটাবিল এলাকায় মাদকবিরোধী মানববন্ধন কর্মসূচিতে হামলা ও গুলির ঘটনায় ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীসহ পাঁচজন আহত হয়। গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী ইথান আহম্মেদ প্রেম কাঁটাবিল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে প্রথমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠান।

 

গত বৃহস্পতিবার নগরীর বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় একটি জলাশয় থেকে জুম্মান নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

 

এদিকে, কুমিল্লা নগরীতে কয়েক ডজন কিশোর গ্যাং সক্রিয় । সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ে। কিছুদিন পরপর বিভিন্ন এলাকায় দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ মহড়া দিলেও নামমাত্র কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বয়স কম হওয়ায় আইনের ফাকফোকর দিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আবার সক্রিয় হয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ।

 

এছাড়া কুমিল্লা নগরীর কিশোর গ্যাং এবং অস্ত্রসহ আটক হওয়া অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশের ওঠাবসার ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ।

 

নগরীর বাগিচাগাঁও এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডের অলিগলিতে মাদক এবং কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। কারা প্রশ্রয় দিচ্ছে এদের? খোঁজ নিয়ে দেখেন রাজনৈতিক নেতারাই আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রেখেছেন মাদক কারবারি এবং কিশোর গ্যাং সদস্যদের ।

 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আলী আহসান টিটু আমার দেশকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে সমাজের মূল্যবোধ জড়িত। গত ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট আমলে মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় হয় । সমাজ একটি ট্রমার মধ্যে ছিল, দেশে কোনো নির্বাচন ছিল না। লুটপাট হয়েছে, দুর্বৃত্তয়ান হয়েছে। মূল্যবোধের পরিবর্তন হতে সময় লাগবে।

 

তিনি আরো বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের কার্যক্রম এখনো স্বাভাবিক হয়নি। আওয়ামী সরকার পুলিশকে দুর্বৃত্তায়নের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। সে অবস্থান থেকে পুলিশ এখন জনগণের পক্ষে এসেছে। তবে তাদের কমিটমেন্ট এক দিনে ফিরে আসবে না ।

 

কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিঙ্কু বলেন, জনসংখ্যার আধিক্য অনুযায়ী অপরাধ খুব একটা বাড়েনি। তবে নিয়ন্ত্রণে সবার প্রচেষ্টা বাড়ানো দরকার।

 

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, বিগত সময়ে লাগামহীন অপরাধের কারণে একটি গ্রুপ কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। অপরাধীরা তাদের কৌশল পাল্টে অপরাধ করছে ।

এই বিভাগের আরও সংবাদ