মানুষের শোরগোলে অতিষ্ঠ, কণ্ঠস্বর বদলে ফেলেছে হিমালয়ের গানের পাখি

ইপেপার / প্রিন্ট ইপেপার / প্রিন্ট
১

ডেস্ক রিপোর্ট: হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলের শান্ত পরিবেশে বসবাসকারী দৃষ্টিনন্দন মোনাল পাখি মানুষের ক্রমবর্ধমান শোরগোলে নিজেদের জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। ভারতের উত্তরাখণ্ডের রাজ্য পাখি এবং নেপালের জাতীয় পাখি হিসেবে পরিচিত এই প্রজাতিটি তাদের সংস্কৃতি ও লোককথার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে। পুরুষ মোনালের পালকে সবুজ, নীল ও তামাটে রঙের অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায়, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের সবসময় আকৃষ্ট করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাহাড়ি এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে পাখিটির স্বাভাবিক আবাসস্থল মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে মানুষের আনাগোনা বাড়ায় পাহাড়ি উপত্যকাগুলোতে শব্দদূষণের মাত্রাও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

উত্তরাখণ্ডের গবেষকদের পরিচালিত দুটি পৃথক গবেষণায় মোনাল পাখির ওপর মানুষের নেতিবাচক প্রভাবের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে পরিচালিত এসব গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক আবাসস্থলে মানুষের ভিড় বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে পাহাড়ের আরও উঁচু এলাকার দিকে সরে যাচ্ছে পাখিগুলো। এছাড়া ব্যস্ত ও কোলাহলপূর্ণ উপত্যকাগুলোতে সম্ভাব্য সঙ্গী বা প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মোনাল তাদের ডাকের তীক্ষ্ণতা বা পিচ পরিবর্তন করতে শুরু করেছে। গবেষক রাজীব লোচনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় মাইক্রোফোন ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের সাহায্যে মোনালের ৭০০টির বেশি ডাক রেকর্ড করা হয়। পর্যটকদের কারণে কোলাহলপূর্ণ চোপতা এলাকার মোনাল পাখি তুলনামূলক শান্ত মাধমহেশ্বর এলাকার মোনালের চেয়ে অনেক বেশি তীক্ষ্ণ কম্পাঙ্কে ডাকছে বলে প্রমাণ মিলেছে।

- Advertisement -

পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মতে, মোনালের কণ্ঠস্বরের এই পরিবর্তন কেবল একটি পাখির আচরণগত বদল নয়, বরং এটি হিমালয়ের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রের অসুস্থতার একটি বড় লক্ষণ। সীমিত এলাকায় বসবাসকারী এবং ঋতুভেদে পাহাড়ি অঞ্চলে চলাচলকারী এই পাখিকে উত্তর-পশ্চিম হিমালয়ের পরিবেশগত স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই নির্দিষ্ট প্রজাতিটি যদি সমস্যার মুখে পড়ে, তবে তা নিশ্চিতভাবেই অন্য সংবেদনশীল বন্যপ্রাণী ও পাখিদেরও বিপন্ন করে তুলছে। হিমালয়ের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পর্যটন নীতি যে পরিবেশগত ভারসাম্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, এই গবেষণাটি তারই একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের অতিরিক্ত চাপের কারণে ভবিষ্যতে মোনালের টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষকরা। ২১০০ সাল নাগাদ ভারতীয় হিমালয়জুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পাখিটির উপযোগী আবাসস্থল আরও সংকুচিত ও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে নতুন উদ্ভিদ জন্ম নিলেও মানুষের উপস্থিতির কারণে মোনালকে আরও বিচ্ছিন্ন ও ছোট পরিসরে বসবাস করতে হচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন দলের মধ্যে প্রজনন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পাখিটির সংখ্যা কমে যাওয়া বা স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তাই হিমালয়ের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই বিভাগের আরও সংবাদ