ওরহান গাজী: ওসমানীয় সাম্রাজ্যের মহাদিগন্ত সূচনায় ঐতিহাসিক নাম—চতুর্থ পর্ব
ইপেপার / প্রিন্ট
ডেস্ক রিপোর্ট: ঐতিহাসিক নিকিয়া শহর জয়ের পর এর শাসনব্যবস্থায় অনন্য উদারতার পরিচয় দিয়েছিলেন উসমানীয় শাসক ওরহান গাজী। পরাজিত রোমান গভর্নর ও তাঁর সৈন্যদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও নিরাপদে শহর ত্যাগের সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি। এছাড়া খাদ্যসংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয় এবং স্থানীয় জনগণের ওপর থেকে কয়েক বছরের জন্য কর সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়। স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার পাওয়ার ফলে শহরটির সাধারণ মানুষ দ্রুতই ওরহানের অধীনে শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করে।
নিকিয়া বিজয়ের পর উসমানীয় সাম্রাজ্যের সৈন্যসংখ্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। বুরসা ও সোগুতসহ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রধান শহরগুলোতে ভিনদেশি বণিকদের করমুক্ত ব্যবসা করার অনুমতি দেওয়া হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষের উপার্জন বৃদ্ধি পায় এবং সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তবে এই অগ্রগতির মধ্যেই সাম্রাজ্য গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বিশিষ্ট ব্যক্তি ও উজির আলাউদ্দিন পাশার মৃত্যু ঘটে। দীর্ঘকাল অসুস্থ থাকার পর ১৩৩৩ সালে তাঁর প্রয়াণ ঘটে, যা শাসক ওরহানকে গভীরভাবে শোকাহত করে তোলে।
আলাউদ্দিন পাশার পাশাপাশি উসমানীয় সাম্রাজ্যের সূচনার দিকের বহু প্রবীণ সেনাপতি ও সহচর এই সময়ের মধ্যেই একে একে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। সেনাপতি কনুর আল্প, শতবর্ষী যোদ্ধা আবদুর রহমান গাজী এবং তুরগুত বে-এর মতো অভিজ্ঞ সামরিক ব্যক্তিত্বদের হারানোয় নেতৃত্বস্তরে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। তা সত্ত্বেও সাম্রাজ্যের সামরিক ও কৌশলগত বিস্তার থেমে থাকেনি। এসব অভিজ্ঞ সেনাপতির অনুপস্থিতির মধ্যেও ওরহান অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নতুন অঞ্চল জয় ও প্রশাসনিক ভিত্তি সুদৃঢ় করার কাজ চালিয়ে যান।
আনাতোলিয়ার বিথিনিয়ায় রোমানদের শেষ ঘাঁটি নিকোমিডিয়া অবরোধের মাধ্যমে ওরহান তাঁর বিজয়ের ধারা অব্যাহত রাখেন। দীর্ঘ চার বছর ধরে চলা এই তীব্র অবরোধের মুখে রোমান সম্রাট কার্যকর কোনো সহায়তা পাঠাতে ব্যর্থ হন এবং শেষ পর্যন্ত শহরটির পতন ঘটে। নিকোমিডিয়া জয়ের পর সেখানেও পরাজিত গভর্নর ও সৈন্যদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে নিজের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও উদার মানসিকতার পরিচয় দেন ওরহান। পূর্বের মতো এখানেও সাধারণ মানুষের কর মওকুফ করা হয় এবং স্থানীয় প্রায় কুড়ি হাজার বাসিন্দা শান্তিতে বসবাসের সুযোগ পায়।
নিকোমিডিয়ার পতনের মধ্য দিয়ে আনাতোলিয়া অঞ্চল থেকে রোমান শাসনের চূড়ান্ত অবসান ঘটে। এই বিজয়ের ফলে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সীমানা সরাসরি রোমান রাজধানী কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত বিস্তৃত বসফরাস প্রণালীর কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এশিয়া মাইনর অঞ্চলে রোমান শক্তিকে অত্যন্ত দুর্বল করে দিয়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যের মহাদিগন্ত উন্মোচনে এই বিজয় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।
