এম. এ. আলিম খাঁন:
৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। প্রতিবছর এ দিনটি বিশ্বজুড়ে শিক্ষকদের অবদান, অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি হিসেবে পালিত হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশাকে সুরক্ষা, মর্যাদা উন্নয়ন এবং আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে ৬০ বছর’। প্রতিপাদ্যের মধ্যেই শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে তাঁদের অপরিহার্য ভূমিকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের শিকড় ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবরের একটি ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক উদ্যোগে নিহিত। ওই দিন ফ্রান্সের প্যারিসে ইউনেস্কো ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আন্তঃসরকার সম্মেলনে শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব, মর্যাদা, পেশাগত স্বায়ত্তশাসন এবং চাকরির শর্তাবলি নিয়ে ‘শিক্ষকদের অবস্থা সম্পর্কিত আইএলও/ইউনেস্কো সুপারিশমালা’ গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালের ১১ নভেম্বর ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনে উচ্চশিক্ষার শিক্ষক ও গবেষকদের মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কিত সুপারিশ যুক্ত হওয়ায় এর পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। ১৯৯৪ সাল থেকে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশেও ২০২৩ সাল থেকে বৈশ্বিক ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৫ অক্টোবর রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতি গঠনে শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত দেশের ১০০ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগও নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এ ধরনের স্বীকৃতি শিক্ষকদের কাজের সামাজিক মূল্যকে দৃশ্যমান করার পাশাপাশি তাঁদের পেশাগত আত্মমর্যাদা ও দায়িত্ববোধকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। একজন শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিদিন এমন শিক্ষার্থীদের পড়ান, যাদের অনেকের বাড়িতে পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ নেই। কোনো শিক্ষার্থী হয়তো তার পরিবারের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী—তার পরিবারে এর আগে কেউ উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করেনি। সেই শিক্ষার্থীর সামনে শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই তুলে ধরেন না; তিনি উচ্চশিক্ষার সম্ভাবনা, স্বপ্ন দেখার সাহস এবং নিজের জীবন বদলে দেওয়ার পথও দেখান।
একজন ভালো শিক্ষক অনেক সময় একটি পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারেন। তাঁর উৎসাহে কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয়মুখী হয়, কোনো শিক্ষার্থী ঝরে পড়া থেকে ফিরে আসে, আবার কেউ হয়তো নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে নতুন করে বিশ্বাস করতে শেখে। তাই শিক্ষককে শুধু একটি পেশার কর্মী হিসেবে দেখলে তাঁর ভূমিকার প্রকৃত ব্যাপ্তি বোঝা যায় না। শিক্ষক মূলত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নির্মাণের অন্যতম প্রধান কারিগর। তবে শিক্ষকদের দায়িত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে তাঁদের ওপর চাপও। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ, খাতা মূল্যায়ন, ফলাফল প্রস্তুত, প্রশাসনিক দায়িত্ব, বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ—সবকিছুর পাশাপাশি তাঁদের দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গেও তাল মিলিয়ে চলতে হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল শিক্ষা, অনলাইন কনটেন্ট এবং নতুন নতুন শিক্ষণপদ্ধতি শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এসব পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তাও বাড়িয়েছে।
প্রযুক্তি শিক্ষকের বিকল্প নয়; বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটি শিক্ষকের সহায়ক শক্তি হতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষককে যদি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সুবিধা ও সময় না দিয়ে কেবল নতুন নতুন দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশা করা হয়, তাহলে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করা কঠিন হবে। শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করতে হলে তাই শিক্ষকের কর্মপরিবেশ, পেশাগত স্বাধীনতা, প্রশিক্ষণ, ন্যায্য পারিশ্রমিক ও সামাজিক মর্যাদার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা কম হওয়ায় ইচ্ছা থাকলেও মেধাবীরা এই পেশায় আসছেন না। আবার যারা আসছেন তাঁরা বিকল্প হিসেবে অন্য কোন পেশাকে পাশাপাশি বেছে নিচ্ছেন। দুঃখজনকভাবে, আমাদের সমাজে শিক্ষকদের কাছ থেকে অনেক প্রত্যাশা থাকলেও তাঁদের পেশাগত বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম। একজন শিক্ষককে আমরা সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাতা হিসেবে দেখতে চাই, কিন্তু তাঁর নিজের কর্মপরিবেশ কতটা সহায়ক—সেই প্রশ্নটি অনেক সময় সামনে আসে না। একজন শিক্ষকের ওপর দায়িত্ব চাপানোর আগে তাঁকে সেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সময়, প্রশিক্ষণ, উপকরণ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষকের মর্যাদা শুধু বেতন-ভাতা বা পুরস্কারের বিষয় নয়; এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির বিষয়। বিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক যেন সম্মানের সঙ্গে কাজ করতে পারেন, মতামত প্রকাশ করতে পারেন, পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ পান এবং অপ্রয়োজনীয় চাপ থেকে মুক্ত থেকে শিক্ষার্থীর দিকে মনোযোগ দিতে পারেন—এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। শিক্ষার্থীর প্রতি আন্তরিকতা, সময়ানুবর্তিতা, নৈতিকতা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং জীবনব্যাপী শেখার মানসিকতা একজন আদর্শ শিক্ষকের অপরিহার্য গুণ। সমাজ যেমন শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করবে, তেমনি শিক্ষকদেরও তাঁদের দায়িত্বের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু শিক্ষার মান কোনো একক সিদ্ধান্ত বা পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় না। এর কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা। আর এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিগুলোর একটি হলেন শিক্ষক।
তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে শুধু ফুল, শুভেচ্ছা কিংবা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষকদের বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। তাঁদের পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়াতে হবে, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও শিক্ষা-উপকরণ দিতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক চাপ কমিয়ে শিক্ষাদানে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে, একজন শিক্ষককে সম্মান করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে সম্মান করা নয়; তাঁর মাধ্যমে একটি প্রজন্মের জ্ঞান, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎকে সম্মান করা। শিক্ষকদের যত বেশি মর্যাদা, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া যাবে, তাঁরা তত বেশি মনোযোগ ও আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
শিক্ষকের মর্যাদা তাই কোনো আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়—এটি মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম পূর্বশর্ত। শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো মানে আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পাশে দাঁড়ানো। আর শিক্ষকদের মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারলেই শিক্ষার মানোন্নয়নের পথ আরও শক্তিশালী হবে।
লেখক: কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী