তিন বছরে পোশাকশ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে তিন ভাগের এক ভাগ

ইপেপার / প্রিন্ট ইপেপার / প্রিন্ট
১

অর্থনীতি ডেস্ক: তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি বৃদ্ধির পর তিন বছর অতিবাহিত হলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের প্রকৃত আয় ও জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। কয়েক বছর আগে যখন পোশাকশ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি বাড়িয়ে সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন সেই অর্থে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হতো, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে তা কিনতে প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ভোক্তা মূল্যসূচকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে শুরু করে চলতি বছর পর্যন্ত মূল্যসূচকের ঊর্ধ্বগতির ফলে শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ কমে গেছে। অথচ এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে দেশীয় মুদ্রার মান কমে যাওয়ায় পোশাক রপ্তানি থেকে মালিকপক্ষ তুলনামূলক বেশি অর্থ আয় করছে, যা শ্রমিকদের আর্থিক সংকটের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে।

বিশ্লেষক ও শ্রমবিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে কখনোই চার সদস্যের একটি শ্রমিক পরিবারের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয় যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। অতীতে সব সময়ই জীবনযাপনের ন্যূনতম প্রয়োজনের তুলনায় বেশ কম মজুরি নির্ধারণ করায়, মজুরি সামান্য বাড়লেও শ্রমিকদের জীবনমানের কোনো স্থায়ী উন্নয়ন হয়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, শহরাঞ্চল ও বিভিন্ন সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় অনেক বেশি, যার একটি বড় অংশ চলে যায় শুধু খাদ্যপণ্য ক্রয়ে। ফলে বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকার মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের পক্ষে বাসাভাড়া পরিশোধ করে পরিবার নিয়ে টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়েছে।

- Advertisement -

তৈরি পোশাক খাতের মজুরি পর্যালোচনা ও নতুন কাঠামো নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় এবার আরও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন গবেষক ও শ্রমিকনেতারা। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, কেবল মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করলেই চলবে না, বরং শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদও একই মত প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, সস্তা শ্রমিকের ওপর নির্ভর করে তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখার পুরনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেল এবং জীবনযাত্রার বাস্তব খরচকে ভিত্তি ধরেই ভবিষ্যৎ মজুরি কাঠামো সাজানো উচিত বলে মনে করেন তারা।

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি ও ধারাবাহিক আন্দোলনের মুখে সরকার সম্প্রতি একটি নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, যা শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতা কমাতে কাজ করছে। মজুরি বোর্ডের ধারাবাহিক বৈঠকের অংশ হিসেবে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা তাদের প্রাথমিক প্রস্তাব জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যদিও মালিকপক্ষ চূড়ান্ত প্রস্তাব দেবে কি না তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এমতাবস্থায়, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এবং শ্রমিকদের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আনতে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য মজুরি নির্ধারণের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই বিভাগের আরও সংবাদ