মেলিওডোসিস: মাটির জীবাণু থেকে প্রাণঘাতী সংক্রমণে বাড়ছে উদ্বেগ
ইপেপার / প্রিন্ট
স্বাস্থ্য ডেস্ক: প্রকৃতির মাটি ও পানিতে বাস করে এমন একটি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার কারণে মেলিওডোসিস নামক গুরুতর সংক্রামক রোগ হয়ে থাকে। বার্কহোল্ডারিয়া সিউডোম্যালি নামের এই গ্রাম-নেগেটিভ জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুস, ত্বক, যকৃৎ, প্লীহা ও কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গ আক্রমণ করতে পারে। কখনো কখনো এটি রক্তে ছড়িয়ে পড়ে সেপসিস বা সারা শরীরে মারাত্মক সংক্রমণ সৃষ্টি করে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং বাংলাদেশেও এই রোগের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। রোগটির লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ সংক্রমণের মতো হওয়ায় এটি দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং চিকিৎসায় দেরি হতে পারে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং উত্তর অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এই রোগের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে থাইল্যান্ডে সম্প্রতি এই রোগের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং স্থানীয়ভাবে একে সয়েল ফিভার বলা হয়ে থাকে। বর্ষাকাল, বন্যা এবং মাটির সংস্পর্শে আসার সুযোগ বাড়লে এই সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশ্বের অনেক অঞ্চলে পরীক্ষাগারের সীমিত সুবিধা এবং এ বিষয়ে সচেতনতার অভাবের কারণে প্রকৃত রোগীর সংখ্যা প্রায়শই কম নিরূপিত হয়। জীবাণুগুলো পরিবেশে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে এবং দূষিত মাটি বা পানির মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে।
সাধারণত সংক্রমিত মানুষ থেকে সুস্থ মানুষের মধ্যে এই রোগ সহজে ছড়ায় না, বরং পরিবেশ থেকেই মানুষ প্রধানত আক্রান্ত হয়। ত্বকের ক্ষতস্থানের মাধ্যমে দূষিত মাটি বা পানির সংস্পর্শে এলে, সংক্রামিত পানি পান করলে কিংবা ঝড়ের সময় উড়ে আসা ধুলাবালি ও পানির ক্ষুদ্র কণা শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করলে এই সংক্রমণ হতে পারে। ডায়াবেটিস মেলিওডোসিসের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণগুলোর একটি। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কিডনি বা ফুসফুসের রোগ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া এবং কৃষিকাজ বা নির্মাণকাজের সুবাদে মাটির সঙ্গে নিয়মিত সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
জীবাণুর সংস্পর্শে আসার পর সাধারণত এক থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে শরীরে নানা লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র জ্বর ও কাঁপুনি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, ত্বকে ঘা বা পুঁজ জমা এবং জয়েন্টে ব্যথা। গুরুতর ক্ষেত্রে রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং একাধিক অঙ্গ বিকল হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এর ভয়াবহ দিক হলো, সঠিক চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যা সত্ত্বেও গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। অতীতে বাংলাদেশে শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য হারে মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
এই রোগের চিকিৎসায় দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজন হয়, যার দুটি প্রধান পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে গুরুতর সংক্রমণের জন্য শিরায় অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন দেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে রোগ ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে কয়েক মাস মুখে খাওয়ার ওষুধ চালিয়ে যেতে হয়। রোগ প্রতিরোধে এখনো কোনো বহুল ব্যবহৃত টিকা আবিষ্কার হয়নি, তাই পরিবেশগত সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং সচেতনতা বৃদ্ধিই প্রধান রক্ষা কবচ। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর বা নিউমোনিয়ার রোগীরা প্রচলিত চিকিৎসায় ভালো না হলে এই রোগের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
