আত্মহত্যা প্রতিরোধে আমাদের করণীয়

ইপেপার / প্রিন্ট ইপেপার / প্রিন্ট
১৫

এম. এ. আলিম খান
১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৭ লাখ ২৭ হাজার মানুষ আত্মহত্যায় মারা যায়। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ২,০৪২ জন মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশেও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল—এই ৫ বছরে দেশে আত্মহত্যাজনিত অপমৃত্যুর ঘটনায় ৭৬,৩৬১ জন মারা গেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৪২ জন লোক আত্মহত্যা করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যায় মারা গেছে ৪,৭১৪ জন। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩ জন মারা গেছে। কিন্তু একই বছর পুলিশের তথ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি আত্মহত্যায় মারা গেছে। প্রতিবছরই বাড়ছে আত্মহত্যার সংখ্যা। প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আত্মহত্যা করছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত আত্মহত্যার ঘটনা পর্যালোচনা করে বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশন একটি প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে, ২০২৪ সালে ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। ২০২৫ সালে ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। ২০২৫ সালে আত্মহত্যায় মারা যাওয়া ৪০৩ জন শিক্ষার্থীর প্রায় ৪৭ শতাংশ স্কুল পর্যায়ের, প্রায় ২৩ শতাংশ কলেজ পর্যায়ের, প্রায় ১৯ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের এবং মাদ্রাসার প্রায় ১১ শতাংশ।
কেন শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যা করছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করে না। মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, পারিবারিক বিরোধ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা ভালো ফলাফল করার চাপ, বুলিং, একাকিত্ব, আর্থিক সংকট, বেকারত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের চাপ যুক্ত থাকতে পারে। তবে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী সাধারণত দুটি প্রধান কারণে আত্মহত্যা করে—একটি হচ্ছে রেজাল্ট বা ফলাফল এবং অন্যটি রিলেশন বা সম্পর্ক।
বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে গ্রামে, আত্মহত্যার বিষয়ে একধরনের নেতিবাচক ধারণা কাজ করে। কেউ আত্মহত্যা করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার পরিবারকে সামাজিক ও মানসিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়। অনেক অভিভাবক আছেন, যারা চান না তার সন্তানকে পোস্টমর্টেম করা হোক। এজন্য অনেক সময় আত্মহত্যা লুকিয়ে মৃত্যুর ভিন্ন কারণ বলা হয়।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম. এ. মুহিত বলেছেন, ‘আত্মহত্যা মোকাবিলায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এককভাবে সরকারের পক্ষে এ সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সমাজের সব পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।’ বাংলাদেশে ১৯৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা অনুযায়ী আত্মহত্যার চেষ্টা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ভলান্টিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ফর বাংলাদেশ (ভাব)-এর সুবিধাভোগী শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, দুটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সন্তানের আত্মহত্যা এবং শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের সুপারিশে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি ও আত্মহত্যা প্রতিরোধে সাইকোথেরাপিস্টের মাধ্যমে নরসিংদীর বেলাবো, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, যশোরের কেশবপুর এবং পাবনার ভাঙ্গুড়ায় মেন্টাল হেলথ কাউন্সেলিং ওয়ার্কশপ করছে। দেশের বিভিন্ন উপজেলায়ও এই কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বিশিষ্ট সাইকোথেরাপিস্ট মকসুদ মালেকের মতে, ‘আত্মহত্যার প্রধান কারণ তিনটি—জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক। জৈবিক কারণের মধ্যে রয়েছে: বিষণ্নতা, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সাইকোসিস ইত্যাদি মানসিক অসুস্থতা, দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র শারীরিক অসুস্থতা ও ব্যথা, ঘুমের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, মাদক বা অ্যালকোহল ব্যবহার, কিছু ক্ষেত্রে জেনেটিক বা পারিবারিক। মনস্তাত্ত্বিক কারণের মধ্যে রয়েছে: তীব্র হতাশা, অসহায়ত্ব, নিজেকে মূল্যহীন মনে করা, অতিরিক্ত অপরাধবোধ বা লজ্জা, তীব্র উদ্বিগ্নতা, আবেগ বা রাগ, সমস্যা মোকাবিলার দক্ষতা দুর্বল হওয়া, হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা, পূর্বে আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টা। সামাজিক কারণের মধ্যে রয়েছে: পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বিচ্ছেদ বা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, চাকরি বা আর্থিক সমস্যা, বুলিং, সামাজিক অপমান, পারিবারিক বা সামাজিক সহায়তার অভাব, বড় ধরনের ক্ষতি বা মানসিক আঘাত, আত্মহত্যার চিন্তার সামাজিক প্রকাশ ইত্যাদি।’
বিশিষ্ট সাইকোথেরাপিস্ট মকসুদ মালেক আত্মহত্যা মোকাবিলার ৫টি উপায়ের কথা বলেছেন। ১. প্রাথমিক শনাক্তকরণ: আচরণ, কথাবার্তা ও মানসিক অবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া সতর্কতামূলক লক্ষণগুলো দ্রুত শনাক্ত করা। ২. সরাসরি কথা বলা: কোনো ধরনের বিচার বা সমালোচনা না করে সহানুভূতির সঙ্গে সরাসরি জিজ্ঞেস করা—আপনার কি নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার চিন্তা হচ্ছে? ৩. নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: ঝুঁকি বেশি থাকলে ব্যক্তিকে একা না রাখা এবং আত্মহানির সম্ভাব্য উপকরণ বা মাধ্যম থেকে তাকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা। ৪. পেশাদার সহায়তা: প্রয়োজনে মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন, পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। ৫. সামাজিক সহায়তা: পরিবার, বন্ধু ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মানসিক ও আবেগীয় সহায়তা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত যোগাযোগ ও খোঁজখবর রাখা।’
যদি কারও তাৎক্ষণিক আত্মহত্যার পরিকল্পনা বা উদ্দেশ্য থাকে, এটিকে জরুরি হিসেবে বিবেচনা করে তাকে একা না রেখে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ বা স্থানীয় জরুরি সহায়তায় যোগাযোগ করা উচিত। এক্ষেত্রে জাতীয় জরুরি সেবা হেল্পলাইন ৯৯৯ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২৫ সালে আত্মহত্যার চেষ্টার ২,৫৬৬টি কল পেয়েছে এবং ১,০৭১টি আত্মহত্যার কল পেয়ে সেবা নিশ্চিত করেছে। ২০২৬ সালে জানুয়ারি-আগস্ট—এই আট মাসে জাতীয় জরুরি সেবা ২,০৮৩টি আত্মহত্যার চেষ্টার কল পেয়েছে এবং এ সময়ে ৪২৭টি আত্মহত্যার কল পেয়ে সেবা নিশ্চিত করেছে।
আত্মহত্যা প্রতিরোধ বা মোকাবিলায় আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—বিচার নয়, সহমর্মিতা; অবহেলা নয়, মনোযোগ; একাকিত্ব নয়, পাশে থাকা। একটি সহানুভূতিশীল কথা, একজন মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা এবং সঠিক সময়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া—একটি জীবন বাঁচাতে পারে।
লেখক: উন্নয়নকর্মী

এই বিভাগের আরও সংবাদ