মাতারবাড়ী বন্দর যেন ভারতের স্বার্থে না হয়

অর্থনীতি ডেস্ক: জাপানের প্রস্তাবিত আঞ্চলিক বাণিজ্য করিডোরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই বন্দরের মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে সামুদ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই ধরনের বড় পরিসরের ট্রানজিট ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ঠিক কী ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা বা প্রতিদান পাবে, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহင် মনে করছে, অপরিকল্পিত বা একপাক্ষিক চুক্তির কারণে শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

প্রস্তাবিত এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত শিল্প মূল্য শৃঙ্খল বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভ্যালু চেইন গড়ে তোলা। তবে বন্দরটির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কীভাবে ভাগ হবে এবং এর প্রকৃত সুফল কারা ভোগ করবে—সে বিষয়ে এখনো যথেষ্ট রাখঢাক রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অবকাঠামোর ব্যয় ও পরিবেশগত ঝুঁকি বহন করতে হয় ছোট দেশকে, অথচ কৌশলগত সুবিধা পেয়ে থাকে বড় প্রতিবেশী। ফলে এই বন্দরটি যেন কোনোভাবেই একতরফা আধিপত্যের হাতিয়ারে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

জাপান সরকারের সঙ্গে ইতোমধ্যে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বিশাল অংকের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার আর্থিক দায় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকেই বহন করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশ কী ধরনের আর্থিক ও কৌশলগত সুবিধা পাবে, তা চুক্তিতে পরিষ্কার করা জরুরি। বন্দরের ফি, পরিবহন মাশুল, গুদামভাড়া এবং লজিস্টিকস খাতের আয় যেন দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীরা যাতে এই বাণিজ্যের যথাযথ সুফল পান, সেই ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু যাতায়াতের পথ উন্মুক্ত করলেই দেশে শিল্পায়ন ঘটে না, বরং এর জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদনে বিনিয়োগ। তাই পণ্যের ধরন নির্ধারণ, পরিদর্শন প্রক্রিয়া, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকতে হবে। সরকার ও নীতিনির্ধারক মহলের উচিত যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের আগে এর চুলচেরা বিশ্লেষণ করা এবং পুরো অর্থায়ন ও ট্রানজিট পরিকল্পনা জনসমক্ষে প্রকাশ করা।