ব্যালন ডি’অর : স্বর্ণের বলের সাত দশকের গল্প

খেলা ডেস্ক: ফুটবল বিশ্বে একটি সোনালি বল মানেই খেলোয়াড়দের কাছে স্বপ্নের চূড়ান্ত স্বীকৃতি। মাঠের অজস্র গোল এবং ট্রফির ভিড়ে এই সম্মান একজন ফুটবলারকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়, যার নাম ব্যালন ডি অর। মূলত ১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের বিখ্যাত ফুটবল সাময়িকী ফ্রান্স ফুটবল ইউরোপের সেরা খেলোয়াড়কে পুরস্কৃত করার উদ্দেশ্যে এই আয়োজন শুরু করেছিল। সে সময় বেশ ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই পুরস্কার প্রথমবার জিতেছিলেন ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি ম্যাথিউস, যিনি তখন একচল্লিশ বছর বয়সে এই কীর্তি গড়েন। দীর্ঘ সাত দশকের পথ পরিক্রমায় সেই ছোট্ট আয়োজন আজ বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত স্বীকৃতিতে রূপ নিয়েছে।

শুরুর দিকে এই পুরস্কারের নিয়মে শুধু ইউরোপীয় নাগরিকত্বধারী ফুটবলাররাই বিবেচনাধীন ছিলেন, যার কারণে পেলে বা ডিয়েগো ম্যারাডোনার মতো মহাতারকারা ইউরোপে খেললেও এই অর্জনের যোগ্য ছিলেন না। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে নিয়মের পরিবর্তন এনে ইউরোপের ক্লাবে খেলা সব দেশের ফুটবলারদের জন্য এর দরজা উন্মুক্ত করা হয়, এবং প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে লাইবেরিয়ার জর্জ উইয়াহ এই গৌরব অর্জন করেন। এরপর ২০০৭ সালে নিয়মের পরিধি আরও বাড়িয়ে বিশ্বের যেকোনো লিগে খেলা ফুটবলারদের জন্য এটি উন্মুক্ত করা হয়। এছাড়া ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ফিফার বর্ষসেরা পুরস্কারের সঙ্গে একীভূত থাকার পর এটি আবার নিজস্ব স্বকীয়তায় ফিরে আসে।

সাংবাদিকদের ভোটের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় ব্যালন ডি অরের বিজয়ী, যেখানে পুরুষ বিভাগে ফিফা র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ একশোটি দেশের এবং নারী বিভাগে শীর্ষ পঞ্চাশটি দেশের প্রতিনিধিরা ভোট প্রদান করেন। প্রথমে ফ্রান্স ফুটবলের সম্পাদকীয় দল একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করে এবং সেখান থেকে ভোটাররা তাদের পছন্দের সেরা খেলোয়াড়দের বাছাই করেন। ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, মাঠে খেলোয়াড়ের প্রভাব, দলীয় সাফল্য এবং ক্রীড়সুলভ আচরণকে মূল বিচার্য বিষয় হিসেবে ধরা হয়। নারীদের ক্ষেত্রে ২০১৮ সালে এই পুরস্কার চালুর পর থেকে আডা হেগারবার্গ, আলেক্সিয়া পুতেয়াস ও আইতানা বোনমাতির মতো তারকারা এই সম্মান অর্জন করেছেন।

এই পুরস্কারের ইতিহাসে রেকর্ড আটবার সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন লিওনেল মেসি, যার ধারেকাছে রয়েছেন পাঁচবারের বিজয়ী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এছাড়া ইয়োহান ক্রুইফ, মিশেল প্লাতিনি ও মার্কো ফন বাস্তেনের মতো কিংবদন্তিরা তিনবার করে এই সোনালি বল জয় করেছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ফুটবলারদের বদল ঘটলেও এবং নানা বিতর্ক কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও ব্যালন ডি অরের আবেদন আজও অম্লান রয়েছে। ১৯৫৬ সালে ইউরোপের সেরা খেলোয়াড় খোঁজার যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের স্থায়ী প্রতীকে পরিণত হয়েছে।