চুরি-ডাকাতি, মাদক থেকে অস্ত্র ধরে চাঁদাবাজি: সাতক্ষীরা কালিগঞ্জে ইয়ার আলী-মাছুরা সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ জেলাবাসী

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:

সাতক্ষীরা জেলায় সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন জেলার সচেতন নাগরিক ও সুশীল সমাজের সদস্যরা। এ চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন জেলার আলোচিত মাছুরা বেগম (৩২), পিং বক্কর, সাং চন্ডিপুর এবং ইয়ার আলী (৪২), পিং মৃত জব্বার, সাং কৃষ্ণনগর-এমন অভিযোগ তুলে তারা পুলিশ সুপার বরাবর একটি লিখিত আবেদন করেছেন।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরা সদর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর থানা এলাকায় একটি কুখ্যাত সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা অজ্ঞান করে চুরি, মোটরসাইকেল চুরি, চাঁদাবাজি, চুরি-ডাকাতি, মাদক ব্যবসা, ব্ল্যাকমেইলসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। এ চক্রের নেতৃত্বে মাছুরা বেগম, ইয়ার আলী, বাহার আলীসহ কয়েকজন সহযোগী সংঘবদ্ধভাবে এসব অপরাধ সংগঠিত করছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

আবেদনকারীদের দাবি, সম্প্রতি মাছুরা বেগম ও তার সহযোগীরা সাতক্ষীরার রহমান, ছোট বাবু, মাসুদ, কালিগঞ্জের ইয়ার আলী, হাফিজ, শ্যামনগরের মতি সাহ সিন্ডিকেটের সদস্য এবং একাধিক মামলার আসামি মাক্ষি রানীকে ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানহানিকর ও ভিত্তিহীন বক্তব্যসম্বলিত ভিডিও প্রচার করেছে। ওই ভিডিওতে সাতক্ষীরা জেলার পুলিশ সুপার, কালিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এবং জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) অফিসার ইনচার্জের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। এর মাধ্যমে প্রশাসনকে বিতর্কিত করে নিজেদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ‘লেডি ডাকাত’ হিসেবে পরিচিত মাছুরা বেগম ও তার সহযোগীরা সাতক্ষীরা শহরের জামায়াত অফিসের অপার সাইটের গলির ভেতরে মো. রবিউল ইসলামের তিনতলা বাড়ির নিচতলার একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে অবস্থান করছে। সেখান থেকেই তারা জেলার বিভিন্ন এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, মাছুরা বেগম শ্রমিক লীগ কর্মী ও মানবাধিকার কর্মী পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে অজ্ঞান পার্টি, চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতি, ব্ল্যাকমেইল ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এছাড়া প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্য, থানা পুলিশের কয়েকজন সদস্য, ভুয়া সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সহযোগিতায় তিনি ও তার সহযোগীরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

আবেদনকারীরা উল্লেখ করেন, গ্রেপ্তারের পরও অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে মুক্ত হয়ে তারা পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। কালিগঞ্জ উপজেলার মধুসূদন কর্মকারের বাড়িতে সংঘটিত ডাকাতির ঘটনায় পুলিশের তদন্তে মোবাইল প্রযুক্তির মাধ্যমে মাছুরা বেগমের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়েছে। তদন্তে তার মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তাকে সাতক্ষীরা শহর থেকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ডাকাতির সময় চুরি হওয়া প্রায় ১০ ভরি স্বর্ণ প্রথমে সাতক্ষীরায় বিক্রির চেষ্টা করেন এবং পরে শ্যামনগর সদরের একটি জুয়েলার্সে তা বিক্রি করার কথা স্বীকার করেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, কালিগঞ্জ থানা এফআইআর নং-০৪, তারিখ ৬ জুলাই ২০২৫, জি.আর নং-১১৯, পেনাল কোডের ৩৯৫/৩৯৭ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, উক্ত মামলায় অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন।

অভিযোগ আরও জানা যায়, কালিগঞ্জ, শ্যামনগর ও আশাশুনি থানা এলাকায় সংঘটিত চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনায় কেউ মামলা করতে গেলে তাদের শারীরিক নির্যাতনসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। এ কারণে ভয়ে অনেকেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে সাহস পান না।

স্থানীয়দের তথ্যমতে, শ্যামনগরের দুই সন্তানের জননী মোছা. মাছুরা বেগম (৩২) ভেটখালি এলাকার কুখ্যাত চোর সুবানের স্ত্রী। সুবান একসময় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আহত হয়ে পঙ্গু হন। ২০১৮ সালে শ্যামনগর বিআরটিসি কাউন্টার মালিকের সঙ্গে সুন্দরবনের এক ডাকাত দলের সদস্য তার দেবরের জন্য ইয়াবা সরবরাহের সময় পুলিশ মাছুরা বেগমকে আটক করে। ২০২৩ সালেও তার বাড়ি থেকে ইয়াবাসহ তাকে আটক করা হয়।

এছাড়া এলাকাবাসীর দাবি, তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর:- ০১৭৯৫-৪৪১৮২৭, ০১৭০৬-৩৮৭৩৫৫ ও ০১৯২৪-২১৭৪৭০-এর মাধ্যমে অপরাধী চক্রের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিভিন্ন অপরাধের পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দেওয়া হয়। উক্ত নম্বরগুলোর কললিস্ট বিশ্লেষণের মাধ্যমে সহযোগীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

উল্লেখ্য, উক্ত চক্রের সদস্যরা আমাকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে শ্যামনগরের দুই সন্তানের জননী তথাকথিত ‘লেডি ডাকাত’ মোছা. মাছুরা বেগমকে ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা চালায়। এতে ব্যর্থ হয়ে ২০১৮ সালে তারা আমার ও আমার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কালিগঞ্জ থানায় একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করে, যা পরবর্তীতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক খারিজ করা হয়।

এদিকে, উক্ত সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের তৎপরতার ফলে এলাকায় চরম নিরাপত্তাহীনতা, আতঙ্ক ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এতে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে এবং সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ভীতি ও আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করছে।

এ পরিস্থিতিতে সচেতন নাগরিক ও সুশীল সমাজের সদস্যরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি দাবি জানিয়েছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-উক্ত সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সদস্যদের দ্রুত গ্রেপ্তারের জন্য বিশেষ অভিযান পরিচালনা, তাদের নিকট থাকা অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ, মাদকদ্রব্য ও চুরি-ডাকাতির লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।

আবেদনকারীরা আশা প্রকাশ করেন, প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে সাতক্ষীরা জেলার সাধারণ মানুষ পুনরায় শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে।