চিকিৎসক-জনবল সংকটে ধুঁকছে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

কালীগঞ্জ (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি

দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল সীমান্তঘেঁষা জনপদ সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৩ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র ভরসাস্থল কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ২০ শয্যার হাসপাতালটি ২০১০ সালের ২৪ ডিসেম্বর ৫০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত হলেও বাস্তব চিত্র পুরোপুরি উল্টো। চিকিৎসকের ৩৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ছাড়া কর্মরত আছেন মাত্র ৫ জন চিকিৎসক। যার ফলে বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের চাপ সামলাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) বেলা ১০টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বহির্বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. রিপন বিশ্বাস এবং জরুরি বিভাগে ১ জন মহিলা উপস্বাস্থ্য সহকারী ছাড়া আর কোনো ডাক্তার নেই। ওই সময় শত শত নারী-পুরুষের দীর্ঘ সারিবদ্ধ লাইন সামলাতে কর্তব্যরত আনসার সদস্যদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্তমানে কালিগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত চিকিৎসকরা হলেন ডা. সুজায়েত হোসেন, ডা. সাইদুর রহমান, ডা. হাবিবুর রহমান (আরএমও), ডা. সাইফুল ইসলাম।

একইভাবে ৩৬ জন সেবিকার পদে আছেন মাত্র ২০ জন এবং মাতৃস্বাস্থ্যের নিরাপদ প্রসবের জন্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ ১০টি মিডওয়াইফ পদের বিপরীতে ৫টি মিডওয়াইফ পদ শূন্য পড়ে আছে। বাকি নার্সিং সুপারভাইজার ও সিনিয়র স্টাফ নার্স ২৬টি পদের মধ্যে সুপারভাইজারসহ ১৭টি পদ শূন্য পড়ে আছে। বাকি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রথম শ্রেণির ৪ ইউনিয়ন পর্যায়ের সহকারী সার্জন ৮ জনসহ ১২টি পদে কোনো ডাক্তার নেই। এর মধ্যে তৃতীয় শ্রেণির ১৪২ জনের মধ্যে ৬৮ জন কর্মচারী কর্মরত আছে, বাকি ৭৪টি পদ শূন্য। চতুর্থ শ্রেণির ২৩ জন কর্মচারীর মধ্যে ১২ জন থাকায় ১১টি পদ খালি আছে। আউটসোর্সিংয়ে ১১টি পদের বিপরীতে ১৮ জনের পরিবর্তে ১ জন আয়া, ১ জন কুক, ১ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ ৩ জন ছাড়া বাকি ১৫টি পদ শূন্য।

হাসপাতালটির অন্যতম বড় বিড়ম্বনা হলো, অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার (ওটি) থাকলেও গাইনি বা কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার না থাকায় কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। একইভাবে সার্জারি টেকনিশিয়ান না থাকায় এক্স-রে রুম তালাবদ্ধ, আল্ট্রাসোনো রুম বন্ধ; এখানে কোটি টাকার আধুনিক ওটি সুবিধা থাকলেও শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান না থাকায় অপারেশন থিয়েটার (ওটি) পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। গাইনোকোলজি ও সার্জারির মতো গুরুত্বপূর্ণ কনসালট্যান্ট পদ শূন্য থাকায় গর্ভবতী মা ও রোগীদের সিজারিয়ান সেকশন কিংবা যেকোনো জরুরি অস্ত্রোপচার সম্পূর্ণ বন্ধ। ফলে বাধ্য হয়ে প্রসূতি মা ও মুমূর্ষু রোগীদের ৩৫-৪০ মাইল দূরে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করে দায় সারা হচ্ছে। অন্যদিকে জরুরি মুহূর্তে ঝুঁকিতে পড়ছে প্রসূতি ও নবজাতকের জীবন। ফলে বাধ্য হয়ে আশেপাশের কোনো বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে চড়া মূল্যে টাকা গোনতে হচ্ছে সেবাপ্রত্যাশীদের।

চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও লোকবলের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। হাসপাতালে একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম করার সোনোলজিস্ট পদ শূন্য, ইসিজি টেকনিশিয়ান নেই, এক্স-রে টেকনিশিয়ান পদ ফাঁকা। লোকবল ও ব্যবহারের অভাবে কোটি টাকার আল্ট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি ও এক্স-রে মেশিন এবং ওটির মূল্যবান সরঞ্জামাদি বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থেকে ধুলাবালিতে ও মরচে ধরে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। দন্ত বিভাগে অনুরূপ যন্ত্রপাতি থাকলেও ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান নেই। চোখের ডাক্তার না থাকায় কোটি টাকার যন্ত্রপাতি লাগালেও শুধুমাত্র অনলাইনের মাধ্যমে যশোর হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোসাদ্দেক হোসেনকে দীর্ঘ ৬ মাস আগে বদলি করলেও তিনি এখনো কালিগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেননি। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. ডালিয়া আক্তার গত ১২ অক্টোবর বদলি হলে তার জায়গায় ডা. নাসির উদ্দিনকে বদলি করা হলেও তিনি মফস্বলের উপজেলা বলে যোগদান না করায় বর্তমানে আবাসিক মেডিকেল অফিসারের পদটি শূন্য থাকায় আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. হাবিবুর রহমান অতিরিক্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করে আসছেন। অন্যদিকে মেডিকেল অফিসার ডা. রুপা রানী পাল মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকায় চিকিৎসাসেবা আরও সংকটে পড়েছে।

বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা আলপনা গোস্বামী, সাকিনা খাতুন, মনিরা বেগম, হালিমা খাতুন, মনোয়ারা খাতুন এ প্রতিনিধিকে জানান, ডাক্তার না থাকায় একজন ডাক্তারের কাছে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না। শুধুমাত্র প্যারাসিটামল, গ্যাসের ওষুধ, এলার্জির ট্যাবলেট, ভিটামিন ট্যাবলেট নিয়ে চলে যেতে হচ্ছে। বাকি ওষুধ বাইরে থেকে কিনে খেতে হচ্ছে। এ ব্যাপারে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমানের নিকট জানতে চাইলে তিনি জানান, চিকিৎসক ও জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো সুরাহা মিলছে না। সাতক্ষীরা জেলা সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালামের নিকট জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিনিধিকে জানান, চিকিৎসক ও জনবল সংকটের বিষয় নিয়ে একাধিকবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হলেও এর কোনো সমাধান মেলেনি। নতুনভাবে যদি কোনো ডাক্তার দেয়, তাহলে কিছুটা সমস্যার সমাধান হবে। নতুন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তার যোগদানের বিষয়টি তিনি স্বীকার করে জানান, যোগদান না করলে আমার কিছু করার নেই। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহলসহ উপজেলাবাসী।