মোস্তাফিজ, বিশেষ প্রতিনিধি, বাংলাদেশ
খুলনা রেলওয়ে স্টেশনের ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম, ওভারব্রিজের তলা কিংবা রেললাইনের নির্জন কোণগুলোতে এখন প্রায়ই চোখে পড়ে গা শিউরে ওঠা এক দৃশ্য। কয়েকটি কোমলমতি শিশু গোল হয়ে বসে মুখের সামনে পলিথিন চেপে ধরে আছে, স্থানীয়রা যাদের এখন ডাকছেন ‘পলিথিনের ভূত’ নামে। জুতো বা টায়ার জোড়া লাগানোর সাধারণ ‘সলিউশন আঠা’ বা স্থানীয় ভাষার ‘ড্যান্ডি’ এখন খুলনা নগরীর ছিন্নমূল ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে সবচেয়ে সস্তা আর মারাত্মক মরণনেশায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে খুলনা স্টেশন এলাকা এখন এই বিষাক্ত নেশার সবচেয়ে বড় অভয়ারণ্যে রূপ নিয়েছে। মাত্র ৩০-৪০ টাকার এই আঠার রাসায়নিক বাষ্প ফুসফুস দিয়ে টেনে তারা সাময়িক যে বিভ্রমের জগতে হারাচ্ছে, তার বিনিময়ে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের লিভার, কিডনি ও কর্মক্ষম মস্তিষ্ক। চিকিৎসকদের মতে, এই আঠায় থাকা টলুইন ও কার্বন-ট্রাই-ক্লোরাইড শিশুদের স্নায়ুতন্ত্রকে স্থায়ীভাবে বিকল করে দিচ্ছে।
স্টেশনের ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মের এক কোণায় পলিথিন মুখে বুঁদ হয়ে থাকা ১০ বছর বয়সী এক শিশুর সাথে কথা বললে বেরিয়ে আসে এই অন্ধকারের গল্প। নিরাপত্তার স্বার্থে ও আইনি সুরক্ষায় শিশুটির সুনির্দিষ্ট তথ্য গোপন রেখে এখানে তার ছদ্মনাম ব্যবহার করা হলো রাকিব। মা-বাবার বিচ্ছেদের পর গত দুই বছর ধরে এই স্টেশনই তার ঘরবাড়ি। সারা দিন স্টেশনে বোতল ও কাগজের টোকাই হিসেবে কাজ করে যা আয় হয়, তার বড় অংশই চলে যায় এই সলিউশন আঠা কিনতে। চোখজোড়া লাল আর জড়ানো কণ্ঠে রাকিব বলে, “সারাদিন ক্ষুধা লাগলে এই আঠার গন্ধ শুঁকি। গন্ধ নিলে আর পেটে ক্ষুধা থাকে না, ঘুম আসে আর মনডা ভালো লাগে। পুলিশ আইলে দৌড়ানি দেয়, কিন্তু রাইতে আবার এখানেই ঘুমাই।” রাকিবের মতো ৭ থেকে ১৫ বছর বয়সী এই শিশুদের পুরোটাই এখন এই বিষাক্ত আঠার নিয়ন্ত্রণে। স্টেশন সংলগ্ন কদমতলা বা নিকটের হার্ডওয়্যার দোকানগুলো থেকে কোনো বাধা ছাড়াই শিশুরা এই বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদানটি সংগ্রহ করছে। নেশার টাকা কম পড়লেই এরা স্টেশন ও আশেপাশে পকেটমার, মোবাইল ছিনতাই ও ট্রেনের মালামাল চুরির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যা স্টেশনের সাধারণ যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি শুধু রেলস্টেশন নয় খুলনা নগরীর বিভিন্ন এলাকা যেমন, রূপসা ঘাট, বয়রা মোড়, শিববাড়ী মোড় এবং সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন জনাকীর্ণ এলাকায় দিনে দিনে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে কোমলমতি শিশুদের ‘সলিউশন আঠা’ বা স্থানীয় ভাষায় ‘ড্যান্ডি’র নেশা।
এই চরম সংকটে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) এবং খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ মাঝেমধ্যে স্টেশনে অভিযান চালিয়ে এই শিশুদের ধাওয়া দেয় কিংবা আটক করে। কিন্তু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে এই জুতো মেরামতের আঠাকে সরাসরি ‘মাদক’ হিসেবে তালিকাভুক্ত না করায় ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে পুলিশ তাড়িয়ে দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই শিশুরা আবার প্ল্যাটফর্মে ফিরে আসছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, প্রশাসনকে শুধু ‘তাড়ানোর’ প্রথাগত ভূমিকা থেকে বের হয়ে, যেসব অসাধু ব্যবসায়ী শিশুদের কাছে এই আঠা বিক্রি করছে, তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে খুলনা স্টেশন সংলগ্ন দোকানগুলোতে শিশুদের কাছে সলিউশন আঠা বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা জরুরি।
তবে সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, রাকিবের মতো শিশুদের কেবল অপরাধী হিসেবে না দেখে তাদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এই শিশুরা চরম দারিদ্র্য, পারিবারিক বিচ্ছেদ ও সামাজিক অবহেলার শিকার হয়েই আজ পথের ধুলোয় নেমেছে। এদেরকে লক-আপে বা জেলখানায় না রেখে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন ও মানসিক কাউন্সেলিং। খুলনা সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর (NGO) উচিত স্টেশনের এই শিশুদের চিহ্নিত করে শহরের সরকারি শিশু সদনে নিয়ে যাওয়া, তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং সাধারণ শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনা। খুলনা রেলওয়ে স্টেশনকে মাদকমুক্ত করতে এবং এই অবোধ শিশুদের অন্ধকার থেকে আলোতে ফেরাতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিক সমাজকে এখনই সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় এই শহরের একটি বড় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে।