গর্ভে সন্তান নিয়ে জীবিকার খোঁজে নদীতে মা

ইপেপার / প্রিন্ট ইপেপার / প্রিন্ট

আব্দুল আলিম, শ্যামনগর সাতক্ষীরাঃ
জলবায়ু পরিবর্তনে কৃষিজমি অনুপযোগী হয়ে পড়ায় জীবিকার জন্য নদীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন শ্যামনগরের উপকূলের নারীরা। তাদেরই একজন দীপালি মুন্ডা, যিনি গর্ভে সন্তান নিয়েও প্রতিদিন চিংড়ির পোনা ধরতে নামছেন লবণাক্ত পানিতে। লবণাক্ত শানি, কাদা আর তীব্র রোদের মধ্যে চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করেই চালিয়ে যাচ্ছেন চার সন্তানসহ পরিবারের জীবন। দারিদ্র্য আর স্বাস্থ্যঝুঁকির মাঝেও অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎই তার প্রতিদিনের লড়াইয়ের শক্তি।

<span;>সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাতিনাখালী গ্রামের তিন দিক নদীবেষ্টিত, মাঝখানে কাদামাটি আর প্রতিনিয়ত টিকে থাকার সংগ্রাম। সুন্দরবন সংলগ্ন এই উপকুলীয় অঞ্চলে কৃষিজমিতে লবণ্যক্ততা বেড়ে যাওয়ায় জীবিকার একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে নদী। তাই বুঝুঁকিপূর্ণ এই পেশায় দিন দিন বাড়ছে নারীদের অংশগ্রহণ। দীপালির মতো অনেক নারীই পরিবার টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন কঠিন পরিবেশে কাজ করতে।

- Advertisement -

<span;>দাতিনাখালী গ্রামের মুন্ডাপাড়ার দীপালি ও তার স্বামী অরুণ মুন্ডার সংসারে রয়েছে চার সন্তান। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া আর তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়ই যেন প্রতিদিন নতুন করে লড়াইয়ে নামায় এই দম্পতিকে।

<span;>সন্তানসম্ভবা দীপালির কোলজুড়ে দেড় মাস পরই আসবে নতুন প্রাণ। দীপালির শরীরে তীব্র রক্তহস্পতা থাকলেও চিকিৎসার অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটের কারণে তিনি নিয়মিত বিশ্রাম নিতে পারছেন না। চিকিৎসকরা তাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবারের পরামর্শ দিলেও বাস্তবতা ভিন্ন। গর্ভের সন্তানকে নিয়েই

<span;>দীপালি মুন্ডা প্রতিদিন নদীতে নেমে বাগদা চিংড়ির পোনা ধরেন। কাদামাটি, লবণাক্ত পানি আর অনিশ্চিত পরিবেশ- সবকিছুকে উপেক্ষা করে কাজ করে যান তিনি। প্রতিটি পোনা যেন তার কাছে শুধু আয়ের উৎস নয়, বরং সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য একেকটি ছোট সঞ্চয়।

<span;>তার স্বামী অরুণ মুদ্রা একজন জেলে। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত নদীতে মাছ ধরে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই চলে চার সন্তানসহ পুরো সংসার। চিকিৎসা, খাবার ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। তাদের জীবন যেন উপকূলের হাজারো নিম্নআয়ের পরিবারের প্রতিচ্ছবি।

<span;>দীপালি জানান, পেটের সন্তানের কথা ভাবি, ভয়ও লাগে। কিন্তু কাজ না করলে তো খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। তাই বাধ্য হয়ে নামতে হয় পানিতে। তার কন্ঠে ক্লান্তি থাকলেও দৃঢ়তা স্পষ্ট- পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার দায়ই যেন তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

<span;>স্থানীয় অরুণও স্বপ্ন দেখেন, তার সন্তানরা শিক্ষিত হয়ে এমন এক ভবিষ্যৎ গড়বে যেখানে নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে প্রতিদিন জীবন বাজি রাখতে হবে না। এ বিষয়ে স্থানীয় নারী সংগঠক শেফালী বিবি জানান, উপকূলের নারীরা এখন পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হলেও তাদের কাজের পরিবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে কাজ করার কারণে তারা নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।

<span;>শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জিয়াউর রহমান বলেন, গর্ভবর্তী নারীদের জন্য এ ধরনের শারীরিক পরিশ্রম ও লবণাক্ত পানিতে দীর্ঘ ময় থাকা খুবই বুঝুঁকিপূর্ণ। এতে রক্তস্বল্পতা বাড়ে, সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে এবং মা ও গর্ভের শিশুর জন্য তৈরি হতে পারে জটিলতা। সুন্দরবন সংলগ্ন এই অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা ও দারিদ্র্যের চাপ নারীদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

এই বিভাগের আরও সংবাদ