পুলিশের বহুমাত্রিক সংকট,রাষ্ট্রীয় সেবার মানোন্নয়নে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি
ইপেপার / প্রিন্ট
মোঃসাইদুল ইসলাম হেলাল বিশেষ প্রতিনিধিঃ রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সামনের সারিতে থাকা বাহিনী হলো বাংলাদেশ পুলিশ। অপরাধ দমন, সড়ক নিরাপত্তা, ভিআইপি নিরাপত্তা, নির্বাচনকালীন দায়িত্ব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই তাদের অব্যাহত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীটি আজ নানা কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে জর্জরিত। থাকার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে যানবাহনের স্বল্পতা, মামলা তদন্তের খরচ, বেতন-ভাতা—প্রায় সবখানেই সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট।প্রথমত, আবাসন সংকট দীর্ঘদিনের। অনেক থানায় পর্যাপ্ত ব্যারাক নেই; অনেক সদস্যকে অস্বাস্থ্যকর ও অপ্রতুল স্থানে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। পরিবার থেকে দূরে, অনিরাপদ ও অস্বস্তিকর পরিবেশে বসবাস কর্মস্পৃহা কমিয়ে দেয়। একটি আধুনিক ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে হলে সদস্যদের ন্যূনতম মানবিক জীবনযাপন নিশ্চিত করাই প্রথম শর্ত।দ্বিতীয়ত, যানবাহন ও সরঞ্জামের স্বল্পতা। চাহিদার তুলনায় গাড়ির সংখ্যা কম থাকায় টহল ও অভিযান ব্যাহত হয়। বিস্তীর্ণ এলাকার দায়িত্ব সামলাতে যানবাহনের অভাব দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোকে কঠিন করে তোলে। পর্যাপ্ত ও মানসম্মত যানবাহন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জ্বালানি বরাদ্দ নিশ্চিত না করলে প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া কঠিন।
তৃতীয়ত, মামলা তদন্তের খরচ বড় চ্যালেঞ্জ। সাক্ষী হাজিরা, ফরেনসিক পরীক্ষা, কাগজপত্র সংগ্রহ, যাতায়াত—সব মিলিয়ে একটি মামলার পেছনে উল্লেখযোগ্য ব্যয় হয়। বরাদ্দ সীমিত থাকায় তদন্তের গতি শ্লথ হয়, কখনো কখনো মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আধুনিক অপরাধ দমনে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত অপরিহার্য; এর জন্য আলাদা ও পর্যাপ্ত তহবিল প্রয়োজন।
চতুর্থত, বেতন-ভাতা ও প্রণোদনা কাঠামো। কর্মঘণ্টা অনির্দিষ্ট, ছুটি সীমিত, ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি—তবু আর্থিক ও সামাজিক স্বীকৃতি অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশার তুলনায় কম। ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত সদস্যদের জন্য ঝুঁকি ভাতা, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক সহায়তাসহ অন্যান্য কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, জনবল ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। দেশের জনসংখ্যা ও অপরাধের ধরণ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুলিশ সদস্যসংখ্যা বাড়েনি পর্যাপ্ত হারে। একাধিক দায়িত্ব পালন, টানা ডিউটি—এগুলো শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি বাড়ায়। পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ ও দায়িত্বের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।
ষষ্ঠত, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি। সাইবার অপরাধ, আর্থিক জালিয়াতি, অনলাইন প্রতারণা—অপরাধের ধরন দিন দিন প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে। কিন্তু সব থানায় আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত জনবল ও পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই। অপরাধ বিশ্লেষণ, ডেটা ব্যবস্থাপনা ও নজরদারিতে উন্নত সফটওয়্যার এবং সাইবার দক্ষতা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
সপ্তমত, মানসিক স্বাস্থ্য ও পেশাগত সহায়তা। ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং সামাজিক চাপ মিলিয়ে পুলিশ সদস্যরা মানসিক চাপের মুখে থাকেন। নিয়মিত মনোসামাজিক সহায়তা ও স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ চালু করা গেলে কর্মদক্ষতা ও মানবিকতা উভয়ই বাড়বে।
অষ্টমত, জনসম্পৃক্ততা ও কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করা প্রয়োজন। পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থা শক্ত না হলে আইনশৃঙ্খলা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। স্বচ্ছতা, সৌজন্যপূর্ণ আচরণ এবং দ্রুত সাড়া—এসব মূল চাবিকাঠি।
নবমত, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা, দুর্নীতি প্রতিরোধ—এসব পদক্ষেপ বাহিনীর ভাবমূর্তি উন্নত করবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা হলে বাজেট ও সম্পদের যথাযথ ব্যবহারও নিশ্চিত হবে।
দশমত, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন। আধুনিক অপরাধ মোকাবিলায় কেবল জনবল বাড়ানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ। তদন্ত দক্ষতা, মানবাধিকার সংবেদনশীলতা, প্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শিতা এবং জনবান্ধব আচরণ বিষয়ে নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করা জরুরি।
একাদশত, নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কার। কাঠামোগত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতা মাঠপর্যায়ের কাজকে ধীর করে দেয়। দায়িত্ব বণ্টনে স্বচ্ছতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা চালু করলে দক্ষতা বাড়বে।
দ্বাদশত, কল্যাণ তহবিল ও পারিবারিক নিরাপত্তা। দায়িত্ব পালনকালে আহত বা নিহত সদস্যদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। সন্তানের শিক্ষা সহায়তা, চিকিৎসা সুবিধা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলে বাহিনীর প্রতি আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
ত্রয়োদশত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাগত নিরপেক্ষতা। পুলিশ বাহিনীকে কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হলে জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বদলি, পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে পেশাগত স্বাধীনতা বজায় রাখাই সময়ের দাবি।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা অপরিহার্য। পুলিশ বাহিনীর সমস্যাকে উপেক্ষা করা মানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই দুর্বল করা। সময়োপযোগী সংস্কার, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং জবাবদিহিমূলক সুশাসন—এই চারটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই একটি দক্ষ, আধুনিক ও জনমুখী পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব।
এখন প্রয়োজন সুপরিকল্পিত রোডম্যাপ, নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার। কেবল ঘোষণা নয়, কার্যকর প্রয়োগই হবে পরিবর্তনের প্রকৃত চাবিকাঠি। রাষ্ট্র যদি পুলিশ বাহিনীকে শক্তিশালী, দক্ষ ও মানবিক করে গড়ে তুলতে আন্তরিক ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন আসবেই। তখন নাগরিকরা পাবে নিরাপদ, নিশ্চিন্ত ও আস্থাশীল সমাজ—যেখানে আইনের শাসন সমানভাবে থাকবে সবার জন্য।
