শুক্রবার ,  ১৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ||  ২রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ -  বর্ষাকাল

৮৯ স্লুইচগেট দিয়ে পানি নিষ্কাশনে বাধা বাঁশখালীর ভয়াবহ জলাবদ্ধতা মনুষ্যসৃষ্ট

প্রকাশিত হয়েছে-

বাঁশখালীতে স্মরণকালের ভয়াবহ জলাবদ্ধতার পেছনে ৮৯টি স্লুইসগেট দিয়ে পানি নিষ্কাশনে বাধাকে দায়ী করেছেন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা। তাদের মতে, স্লুইসগেটগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, জবরদখল এবং জাল বসিয়ে মাছ শিকারের কারণে পানি নিষ্কাশনে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পাহাড়ি ঢল ও সমুদ্রের জোয়ারের পানি প্রবাহিত হতে না পেরে পুরো বাঁশখালীর কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।

 

জানা যায়, উপজেলার ৮৯টি স্লুইসগেটের অধিকাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। তহবিল সংকটের কারণে এসব গেট নিয়মিত সংস্কার না হওয়া, স্থানীয় প্রভাবশালী কর্তৃক অপরিকল্পিতভাবে মাছ চাষ ও চিংড়ি ঘের তৈরির জন্য জলকদর খালের মতো প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন পথগুলোতে অবৈধ বাঁধ ও স্লুইসগেট বন্ধ করে রাখে। পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যমে জলকদর খালসহ ছোট-বড় অনেক খাল পলিমাটি জমে ও দখল হয়ে ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে পানি দ্রুত সাগরে নামতে না পারার কারণকে দুষছেন বন্যায় ক্ষতিগ্রতরা।টানা ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলের পানির সঙ্গে সাগরের জোয়ারের পানি মিশে জলাবদ্ধতা তীব্র আকার ধারণ করে। খালের স্বাভাবিক প্রবাহে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও নদী-খাল দখল জলাবদ্ধতাকে দীর্ঘায়িত করেছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে ও ৮৯টি স্লুইসগেট সচল করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে সরকারি পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ।

 

স্থানীয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, ১৯৭০ ও ১৯৮০–এর দশকে ৪০ থেকে ৫৬ বছর আগে নির্মিত এসব স্লুইচগেটের অধিকাংশই বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বাঁশখালীর মানুষের ফসলি জমি ও বসতভিটা জোয়ারের নোনা পানির আগ্রাসন থেকে রক্ষায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মোট ১৪৯.৮৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জোয়ারের নোনা পানি ঠেকানো এবং ভাটার সময় বৃষ্টির পানি দ্রুত সাগরে নিষ্কাশনের জন্য ৮৯টি স্লুইচগেট নির্মাণ করা হয়।

 

প্রাথমিকভাবে মাছ ও লবণের ঘের রক্ষায় স্লুইচগেট বন্ধ করে দেওয়াকেই দায়ী করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়মতো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্লুইচগেটগুলো এখনও কার্যকর রাখা সম্ভব হতো। কিন্তু বছরের পর বছর প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় এখন অনেক স্লুইচগেটই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অচল স্লুইচগেটগুলো দ্রুত সচল আধুনিকায়ন না করা হলে ভবিষ্যতে উপকূলীয় এলাকার পানি ব্যবস্থাপনা আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে অভিমত দেন সচেতন জণগণ। বাঁশখালী প্রায় ২০-৩০টি ছোট–বড় পাহাড়ি ছড়া ও খাল রয়েছে। সেগুলো দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে। এতে স্লুইচগেট কানেক্টিং খালগুলো দীর্ঘদিন খননের অভাবে পানি নিষ্কাশনের কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

 

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি যেন জোয়ারের সময় লোকালয়ে প্রবেশ করতে না পারে, সেভাবে ডিজাইন করে স্লুইচগেট নির্মাণ করা হয়েছিল। স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, জোয়ারের সময় এই গেটগুলো বন্ধ রাখা হয় যেন সমুদ্রের পানি ভেতরে ঢুকতে না পারে। আর ভাটার সময় গেটগুলো খুলে যায়, যেন উজানের বন্যার পানি ও বৃষ্টির পানি নদী হয়ে সাগরে চলে যেতে পারে।

 

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ–বিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল বলেন, বাঁশখালীর স্লুইচগেটগুলোর বেশিরভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাই এগুলো পর্যায়ক্রমে প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সংখ্যাও বাড়াতে হবে। স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো বন্ধ করার কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

 

আর দীর্ঘমেয়াদে ৩৩টি স্লুইচগেট প্রতিস্থাপন, জলকদর খাল ও ছোট ছনুয়া খালের পুনঃখনন এবং কয়েকটি স্থানে বাঁধ পুনর্বিন্যাস (রি–সেকশনিং) কাজ অন্তর্ভুক্ত করে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হচ্ছে। আগামীতে ডিপিপিটি জমা দেওয়া হবে।