প্রযুক্তি ডেস্ক: মহাবিশ্বের চালিকাশক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পদার্থবিজ্ঞানীদের বিভ্রান্ত করে রাখা অন্যতম বড় রহস্য হলো কোয়ান্টাম মহাকর্ষ। সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মতো বিজ্ঞানের বিপরীতমুখী দুটি মৌলিক নীতিকে একত্রিত করার এই জটিল প্রচেষ্টায় বর্তমানে বিশ্বজুড়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তরুণ পদার্থবিজ্ঞানী সাবরিনা পাস্তারস্কি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাঁকে অনেকেই পরবর্তী আইনস্টাইন হিসেবে আখ্যায়িত করলেও তিনি এই উপাধিকে বিনয়ের সাথেই নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের তকমা কাজের বড় একটি প্ল্যাটফর্ম পেতে সাহায্য করলেও মূল লক্ষ্য কেবল গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের জটিল ধাঁধা উন্মোচন করা। বর্তমানে কানাডার পেরিমিটার ইনস্টিটিউটে কর্মরত এই বিজ্ঞানী অত্যন্ত নিভৃতে মহাবিশ্বের মৌলিক সত্যগুলো উদঘাটনে কাজ করে যাচ্ছেন।
তাঁর গবেষণার মূল বিষয়বস্তু হলো সেলসেটিয়াল হ্যালোগ্রাফি যা এমন একটি তত্ত্ব, যা দেখায় যে পদার্থবিদ্যার দুটি ভিন্ন বিবরণ কীভাবে প্রকৃতপক্ষে একই বাস্তবতার প্রতিফলন হতে পারে। ১৯৯৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানী হুয়ান মালদাসেনা প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন যে আমাদের ত্রিমাত্রিক বাস্তবতার প্রতিটি ঘটনা বস্তুত দ্বিমাত্রিক কোনো তলের প্রক্ষেপণ বা হলোগ্রাম হতে পারে। তবে মালদাসেনার সেই মডেলটি কার্যকর ছিল কেবল এক ধরনের বিশেষ বাঁকানো স্থান-কালের ক্ষেত্রে। পাস্তারস্কির প্রস্তাবিত সেলসেটিয়াল হ্যালোগ্রাফি তত্ত্বটি মালদাসেনার সেই ধারণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে এনে আমাদের এই বাস্তব ও সমতল মহাবিশ্বের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করছে।
পাস্তারস্কির মডেল অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সমস্ত কোয়ান্টাম কণার সংঘর্ষ ও গতিপ্রকৃতিকে অসীম দূরত্বে থাকা একটি দ্বিমাত্রিক গোলকের ওপর বিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে পুরো মহাবিশ্বের চারমাত্রিক পদার্থবিদ্যাকে একটি দ্বিমাত্রিক গোলকীয় সীমানার মাধ্যমে পুনর্গঠন করার গাণিতিক পরিকাঠামো তৈরি করছেন তিনি। বাল্যকাল থেকেই পাস্তারস্কির অসাধারণ মেধার পরিচয় পাওয়া যায় এবং তিনি কৈশোরেই নিজের বিমান নিজে তৈরি করে আকাশে ওড়াতে সক্ষম হন। অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকলেও পরবর্তীতে তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে পদার্থবিদ্যায় ডিগ্রি অর্জন করেন এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। প্রযুক্তি জগতের শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও অন্যের নির্মিত প্রযুক্তি ব্যবস্থার অংশ হওয়ার চেয়ে নিজস্ব গাণিতিক অনুসন্ধানে মন দেওয়াই যুক্তিসঙ্গত মনে করেন এই মেধাবী গবেষক।
তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার এ ধরনের কোয়ান্টাম তত্ত্বসমূহ সচরাচর পরীক্ষা করা বেশ কঠিন হলেও পাস্তারস্কি তাঁর তত্ত্ব প্রমাণের কিছু সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। কৃষ্ণগহ্বরগুলোর সংঘর্ষের সময় স্থান-কালে যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তৈরি হয়, তা স্থায়ী কিছু পরিবর্তন রেখে যায় যাকে স্পিন মেমরি ইফেক্ট বলা হয়। পাস্তারস্কির মতে, এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ঘূর্ণন সংক্রান্ত তথ্য সরাসরি তাঁর দ্বিমাত্রিক সেলসেটিয়াল স্ফিয়ার সংক্রান্ত সমীকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। আগামী দশকে মহাকাশে উৎক্ষেপণের জন্য নির্ধারিত লিসা নামক মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এই তাত্ত্বিক সূত্রের প্রামাণিক তথ্য খুঁজে পেতে পারে। এছাড়া সার্নের লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারের কণা সংঘাত থেকে প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যেও এই নতুন গাণিতিক কাঠামোর উপস্থিতি পরীক্ষা করার সুযোগ রয়েছে। মহাবিশ্ব সত্যিই কোনো দ্বিমাত্রিক তলের ছায়া নাকি ত্রিমাত্রিক বাস্তবতাই পরম—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, গাণিতিকভাবে যদি দুটি বিবরণই সমান ও পারস্পরিক রূপান্তরযোগ্য হয়, তবে দুটির যেকোনো একটিকে সত্য ধরে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।