শিশুর প্রকৃত পরিচর্যাকারীকে অভিভাবকত্বের স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি
ইপেপার / প্রিন্ট
আইন-আদালত ডেস্ক: বাংলাদেশের প্রচলিত আইনি ব্যবস্থায় বাবাকে শিশুর স্বাভাবিক অভিভাবক হিসেবে বিবেচনা করার কারণে নানা আইনি ও সামাজিক জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে মায়ের কাছে সন্তান প্রতিপালিত হলেও তারা স্কুলে ভর্তি, জরুরি চিকিৎসাসেবা কিংবা বিদেশভ্রমণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাজে সন্তানের পক্ষে আইনি সিদ্ধান্ত নিতে বা নথিপত্র স্বাক্ষর করতে গিয়ে চরম ভোগান্তির মুখে পড়েন। এই ধরনের আইনি সীমাবদ্ধতা ও বৈষম্য দূর করে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ ও কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য প্রকৃত পরিচর্যাকারীকে অভিভাবকত্বের আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। রাজধানীর দৃকপাঠ ভবনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স, ইকুয়ালিটি অ্যান্ড পলিসি বা সিজিইপির উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ সংলাপে দেশের নীতিনির্ধারক, আইন বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীরা এই অভিমত প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে আয়োজক সংস্থার পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয় যে, বিদ্যমান পারিবারিক আইন সম্পূর্ণ বদলে ফেলা বা তাকে চ্যালেঞ্জ করা এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য নয়। বরং বর্তমান আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই শিশুর সার্বিক কল্যাণ বিবেচনা করে প্রকৃত পরিচর্যাকারীকে অভিভাবকত্বের আইনি অধিকার দেওয়ার বাস্তবসম্মত পথ খুঁজে বের করাই এই আয়োজনের উদ্দেশ্য। সংলাপে বক্তারা আলোচনা করেন যে, অনেক সময় আদালতের অনুকূল রায় পাওয়ার পরও দীর্ঘসূত্রিতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সমাজের রক্ষণশীল মনোভাবের কারণে অভিভাবকত্ব নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি আইনি স্বীকৃতি পাওয়ার পর সামাজিক অসহযোগিতা ও মানসিক চাপ মোকাবিলার মতো বাস্তব সমস্যাগুলোর কথাও উঠে আসে এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায়।
সংলাপে অংশ নিয়ে দেশের বিশিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা ঔপনিবেশিক ও পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতাসম্পন্ন আইনি বিধানগুলোর সংস্কারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন জানান যে, সংসদ ও আদালতের মাধ্যমেই এই আইনি সংস্কার সম্পন্ন করার বিভিন্ন পথ উন্মুক্ত রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি বিচারক ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অভিভাবকত্ব নিয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব রাখেন। অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা শুধু নতুন আইন প্রণয়ন করলেই চলবে না, বরং মাঠপর্যায়ে তার সঠিক প্রয়োগ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন যাতে কোনো শিশুকে অভিভাবকহীনতার ঝুঁকিতে পড়তে না হয়।
নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গও শিশুর অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত আইনি জটিলতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন উল্লেখ করেন যে, শিশুর পরিচর্যা একটি দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক বিনিয়োগ হলেও নীতিন্ধারারণী পর্যায়ে এটি প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে যায়। এছাড়া নারী ও শিশু বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্যরা বিধবা মায়ের পুনর্বিবাহের পর সন্তানের অভিভাবকত্ব হারানোর আশঙ্কা এবং তার ফলে মায়ের ব্যক্তিগত স্বাধীনত ক্ষুণ্ন হওয়ার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোও তুলে ধরেন। সব মিলিয়ে বিচ্ছেদ কিংবা অভিভাবকের মৃত্যুর পর শিশুর ভবিষ্যৎ যাতে কোনোভাবেই অনিশ্চয়তার মুখে না পড়ে, সে জন্য আইনি পরিসর আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানান সংলাপে উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা।
