বিশ্বায়নের তত্ত্বের আলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ইপেপার / প্রিন্ট
ডেস্ক রিপোর্ট: বিশ্বায়ন ও গণমাধ্যমের ধারাবাহিকতায় আধুনিক যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসার কেবল তথ্য ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিচ্ছে না, বরং মানুষের সংস্কৃতিকেই কাঁচামাল ও উপাত্ত হিসেবে ব্যবহার করে মুনাফা অর্জনের পণ্যে পরিণত করছে। মার্শাল ম্যাকলুহানের বিশ্বগ্রাম, হার্বার্ট শিলারের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ এবং অর্জুন আপ্পাদুরাইয়ের বৈশ্বিক প্রবাহের ধারণার আলোকে গবেষকরা দেখিয়েছেন যে এআইয়ের অবকাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অল্প কয়েকটি উন্নত দেশ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত। এর ফলে উন্নয়নশীল সমাজ, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং স্বল্প সম্পদসমৃদ্ধ ভাষাগুলো নতুন বৈষম্য ও আধিপত্যের মুখে পড়ছে, যা বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক সংকট তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় এআই প্রযুক্তির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার নিয়ে নতুন বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সচেতন হয়েও সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরির প্রতিযোগিতায় অতিদ্রুত এগিয়ে চলেছে। এছাড়া সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক পরীক্ষার সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন এজেন্টের অননুমোদিত যোগাযোগ ও সহযোগিতার ঘটনা মানুষের কমান্ডের বাইরে এআইয়ের স্বায়ত্তশাসিত সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। গবেষকদের আশঙ্কা, এই হারে বুদ্ধি বাড়তে থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যে এআই বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রযুক্তির এই দ্রুত প্রসারের পেছনে কাজ করছে আজকের পুঁজিবাদের অন্তর্হিত উদ্দেশ্য ও অতি মুনাফা অর্জনের মানসিকতা। টেক জায়ান্ট ও বিলিয়নিয়াররা আরও ধনী হওয়ার প্রতিযোগিতায় এআই ও রোবোটিকস খাতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন, যেখানে কারখানা থেকে ধীরে ধীরে শ্রমিকদের বাদ দিয়ে মেশিনের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে। আশি ও নব্বই দশকের মুক্তবাজার অর্থনীতিনির্ভর নয়া উদারবাদী বিশ্বায়নের ধারাবাহিকতায় আজকের এই পরিস্থিতি নির্মিত হয়েছে, যেখানে মানুষের ভালো-মন্দ দেখার দায় এড়িয়ে কেবল মুনাফাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এআইয়ের এই অতিমাতাল বা হাইপ সংস্কৃতির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য উপাত্ত আহরণ, ভাষাগত বৈষম্য এবং অ্যালগরিদমিক পক্ষপাতের নতুন স্তর তৈরি হয়েছে। বেশিরভাগ ভাষা মডেল ইংরেজিনির্ভর হওয়ায় বিশ্বের হাজার হাজার বিপন্ন ও স্বল্প সম্পদসমৃদ্ধ ভাষা এবং সেগুলোর সংস্কৃতি আরও বেশি প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে উন্নত দেশের কোডিং চর্চার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এসব প্রযুক্তি পশ্চিমকেন্দ্রিক মানদণ্ড ও জ্ঞানচর্চার পদ্ধতিকে একমাত্র বাস্তবতা হিসেবে চাপিয়ে দিচ্ছে, যা স্থানীয় বৈচিত্র্য ও স্বকীয়তাকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলছে।
তবে এই প্রাযুক্তিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে স্থানীয় উদ্যোগ, বহুভাষিক উপাত্ত সংগ্রহ এবং জবাবদিহিমূলক শাসনের মাধ্যমে বিকল্প পথ তৈরি করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এআইকে মানবসংস্কৃতির সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এর উন্নয়ন ও ব্যবহারে ভাষাগত বৈচিত্র্য, ন্যায্য শ্রমনীতি এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায়, উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ ও বহুভাষিক অবকাঠামো ছাড়া এআইয়ের এই দ্রুত প্রসার বিশ্বায়নের ইতিহাসে সাংস্কৃতিক সংকোচনের সবচেয়ে বড় রূপ হয়ে উঠতে পারে।
