শুক্রবার ,  ৬ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ||  ২১শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ -  হেমন্তকাল

ইসরায়েলে রেজিম চেঞ্জ: ফিলিস্তিননীতির পরিবর্তন, নাকি দখলদারত্বের নতুন কৌশল

প্রকাশিত হয়েছে-

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইসরায়েলের রাজনীতিতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে গাদি আইজেনকটের সম্ভাব্য উত্থান ফিলিস্তিনিদের সামনে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে। নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটলে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো আইজেনকট প্রধানমন্ত্রী হলে ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় নীতিতে আদৌ কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসবে, নাকি কেবল আগ্রাসনের ধরন ও ভাষা বদলাবে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে দুই নেতার রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্যের পাশাপাশি ইসরায়েলের বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে, যার শিকড় দেশটির রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যে প্রোথিত রয়েছে।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন শিবির ৫৩টি আসন পেলেও সরকার গঠনের জন্য তা যথেষ্ট নয় এবং গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন শিবির পেয়েছে ৪৮টি আসন। ফলে কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের অবস্থানে নেই, তবে আরব দলগুলোর সমর্থন ও সহযোগিতায় আইজেনকটের সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সরকার গঠিত হলে আরব দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় কিছু ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখা যেতে পারে। কিন্তু নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের মধ্যে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে মৌলিক কোনো মতপার্থক্য নেই এবং উভয় পক্ষই জায়নবাদী প্রকল্পের মূল লক্ষ্যগুলোর প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এছাড়া নতুন আইনসভার প্রায় নব্বই জন সদস্য ডানপন্থী অথবা উগ্র ডানপন্থী অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করায় কোনো সরকারই ফিলিস্তিন প্রশ্নে সহজে মৌলিক ছাড় দিতে পারবে না।

নেতানিয়াহু সরকারের রাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে সামরিক শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, আগাম হামলা এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ। অন্যদিকে আইজেনকটের সম্ভাব্য সরকারের কৌশল কিছুটা ভিন্ন হতে পারে, যেখানে তারা ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি কূটনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দেবে। তবে এই কৌশলগত পার্থক্যের অর্থ ফিলিস্তিনিদের জাতীয় অধিকার স্বীকার করে নেওয়া নয়, বরং বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি অনুসরণের সম্ভাবনাই বেশি। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন আগাবেকিয়ান জানিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করলে তাঁরা যেকোনো পক্ষের সঙ্গেই কাজ করতে প্রস্তুত। তবে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বকে উপেক্ষা করে কিংবা তাদের জোরপূর্বক সরিয়ে দিয়ে কোনো রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়।

আইজেনকটের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিতে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে, তবে সেটি ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা কিংবা জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তন হবে না। গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে এই সরকারের অগ্রাধিকার হবে হামাসকে নির্মূল করা এবং ইসরায়েলের শর্ত মেনে চলে এমন একটি সীমিত প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। ফলে ইসরায়েলের সামরিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এলেও দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে অগ্রগতি এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত রয়ে গেছে। ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও অস্তিত্বের বাস্তবতাকে অস্বীকার করে এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।